সকাল ৬:১৭ | ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
ব্রেকিং নিউজ

ভাটিয়ালীর করুণ দর্শন তত্ত্ব

বাংলার নৈসর্গিক রূপবৈচিত্র্যের ঐশ্বর্য প্রকৃতি যেন অকৃপণ হাতে এখানে সেখানে আনাচে কানাচে জালের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে। এই অপরূপ সৌন্দর্যের মতো লোকসংগীতের ভাণ্ডারেও রয়েছে অফুরন্ত ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি। কোন মানুষ সারাজীবন ধরে সংগ্রহ করলেও এ ভাণ্ডার সহসা শেষ হবে না। তবে ভূ-প্রকৃতিগত কারণ যেহেতু মানুষের জীবনধারা ও পেশাককে প্রভাবিত করে, তাই এক অঞ্চলের সংস্কৃতির সাথে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতির পার্থক্য দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভাওয়াইয়া এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ভাটিয়ালী গানের জনপ্রিয়তা খুব বেশি লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশ মূলত একটি ব-দ্বীপ। আমাদের এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই বাংলার লোকশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে সবচেয়ে বেশি। অসংখ্য নদী-নালা বেষ্টিত এই ব-দ্বীপ বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে পরম আত্মীয়ের মতো। এই ব-দ্বীপে মানুষের সাথে মানুষের মিলন ঘটায় মাঝি, তার নৌকা এবং ভাটিয়ালী। তাই বাংলাদেশের এই ভূ-প্রকৃতিই যেন আমাদের ভাটিয়ালীকে রানীর মুকুট পরিয়ে রেখেছে পরম মুগ্ধতায়।

ভাটিয়ালী গান প্রধানত নিচু ভূমি অঞ্চলের গান হলেও অন্যান্য অঞ্চলে এর জনপ্রিয়তার কথা অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশের পশ্চিম অঞ্চলের তুলনায় পূর্বাঞ্চল, অর্থাৎ ময়মনসিংহ-সিলেট অঞ্চলের বিস্তৃৃত নদী এবং নিম্নভূমিই এই ভাটিয়ালী গানের মূল উৎস বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তাদের মতে, যমুনা এবং মেঘনা নদীর উপত্যকায়ই এই গান পরিপূর্ণতা লাভ করেছে সবচেয়ে বেশি। তবে ফরিদপুর, খুলনা এবং বরিশালকেও ভাটি অঞ্চল বলে মনে করেন অনেকে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে এর জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর প্রসার লাভ করতে থাকে।

সময়গত তথ্যের উৎস খোঁজ করলে দেখা যায় যে, বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদে ভাটিয়ালী গানের নমুনা পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাংলা ভাষা যেখান থেকে শুরু, ভাটিয়ালী গান তখন থেকেই প্রচলিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ কোন রোমান্টিক গল্প বা যুদ্ধের কাহিনি দিয়ে রচিত হয়নি। এটি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের রচিত দুঃখের গীতিকা, যেখানে ভাটিয়ালীর নমুনা পাওয়া গেছে।

চর্যাপদে আছে ‘গঙ্গা যমুনা মাঝারে বহই নদী’ অর্থাৎ গঙ্গা যমুনার মাঝে নৌকা চলে।

‘সোনে ভরিল করুনা নবী মোর’। অর্থাৎ সোনায় ভরা আমার করুনা নদী। এ থেকেই বোঝা যায় যে, গঙ্গা ও যমুনার মাঝখান থেকেই ভাটিয়ালীর উৎপত্তি, যা কালের দিক থেকে একাদশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বাংলার পূর্বাঞ্চলের অসংখ্য নদী-নালা সবুজ ঘন বন, পাহাড়ের আশপাশ থেকে গাঁ ঘেঁষে ঘেঁষে আঁকা-বাঁকা স্রোত মুহুর্মুহু কলতান সৃষ্টি করে বয়ে চলে। এই স্রোতের বৈঠার আঘাতে নদীর জলের ঘর্ষণে যে স্পন্দন ও দ্যোতনা তৈরি হয়, তা কোনো কৃত্রিম বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই যেন ভাটির মাঝির জীবন সংগ্রামের প্রেরণা জুগিয়ে তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে-
‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে
আমি আর বাইতে পারলাম না।
সারা জনম উজান বাইলাম
ভাটির নাগাল পাইলাম না।
আমি আর বাইতে পারলাম না।
সুখের দেশের সুখের নদী কান্দে বাইয়া যায়।
সুখের আশায় দুঃখের নদী কান্দে বাইয়া যায়।
মন মাঝি তুই বাভুল যেমন
আমি কপাল পোড়া তেমন।
সুখে দুঃখে কিনারা পাইলাম না।’
বিষয়গত দিক থেকে ভাটিয়ালী গান প্রধানত তিন ধরনের। যথা- লৌকিক প্রেম, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং আধ্যাত্মিকতা।

লৌকিক প্রেম
লৌকিক প্রেম বিষয়ক ভাটিয়ালী গান কখন থেকে শুরু হয় তা জানা যায়নি, তবে লৌকিক গানগুলো কোনো ধর্মের প্রভাবে প্রভাবিত হয়নি- সে কথা জানা গেছে। এর কবি বা রচয়িতা বাংলার সাধারণ মানুষ এবং লোককবি। নৌকার মাঝি যখন একাকী নিঃসঙ্গ নির্জনতায় বিচ্ছেদেও বেদনায় দগ্ধ অথবা দীর্ঘদিন পেশাগত কারণে নৌকা নিয়ে ভাসতে থাকে তখন তাদের হয়তোবা মনে পড়ে যায় প্রিয়তমা স্ত্রীর মুখখানি। তাই মাঝিদের জীবনের এই অবস্থা, শুধু মাঝি মাত্রেরই অভিব্যক্তি। কোন বিশেষ কবি বা রচয়িতা এগুলো রচনা করেননি।
‘আরে ও রে সুজন নাইয়া-
কোন বা দেশে যাও রে তুমি, সোনার তরী বাইয়া।।
কোন বা দেশে বাড়ি তোমার, কোন বা দেশে যাও।
এই ঘাটে লাগাইয়া দাও, আমায় লইয়া যাও।।
সোনার তরী, রঙ্গের বাদাম দিয়াছি উড়াইয়া।
পূবালী বাতাসে বাদাম উড়ে রইয়া রইয়া।।’
গ্রামবাংলার অতিসাধারণ মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই লৌকিক প্রেমের ভাটিয়ালী গানের মধ্যেই বিরাজ করে এক অতি অসাধারণ করুণ রোমান্টিকতা, যা বর্তমান প্রজন্মের গীতিকারদের কাছে চরম বিস্ময়! তিন ধরনের ভাটিয়ালীর মধ্যে লৌকিক প্রেমের ভাটিয়ালীই সবচেয়ে পুরনো বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

রাধাকৃষ্ণের প্রেমালীলা
দ্বিতীয় ধারার ভাটিয়ালীর মধ্যে রয়েছে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের কবিতাগুলো চমৎকার সাহিত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কখনো কখনো এগুলো গান হিসেবেও বেশ প্রচলিত ছিলো। ষোল-সতের শতকের মাঝামাঝি সময়ে বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্য যখন অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে, তখন অন্যান্য পল্লী গানের মত রাধাকৃষ্ণের প্রেমালীলা বিষয়ক ভাটিয়ালী গানও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বৈষ্ণব ধর্মমতে, ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে রয়েছে এক আনন্দময় প্রেমের সম্পর্ক। এই মতের অনুসারীরা এ পথেই সন্ধান করেন ভগবানের। বৈষ্ণবেরা ভক্ত ও ভগবানের মধুর সম্পর্ক বোঝানোর জন্য রাধা ও কৃষ্ণের কাহিনিকে রূপক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাদের কাছে রাধা হচ্ছে ভক্তের প্রতীক, আর কৃষ্ণ ভগবানের।
বৈষ্ণব, সুফী, বাউল এই বিভিন্ন ধর্মমতের সাথে ভাটিয়ালী দর্শন যুগে যুগে প্রভাবিত হয়েছে। তাই এদের সাথে ভাটিয়ালীর দর্শনের অত্যন্ত সুক্ষ্ম মিল লক্ষ্য করা যায়।
‘নিদাগাতে দাগ লাগাইলা প্রাণবন্ধু কালিয়া,
আরে, প্রেম জ্বালায় প্রাণ যায়।
বল সজনী, প্রাণ যায়।
বল সজনী, বংশী ধ্বনি শুনা যায়।।
ওগো, কদম্বেরি ডালে বংশী বাজায় শ্যাম রায়।
হাইটা যাইতে পাড়ার লোকে যত মন্দ বলে যায়।।
(ও প্রাণ-সই, প্রাণ সই গো),
ওগো, লোকের মন্দ পুষ্প চন্দন অলংকার পরেছি গায়।।’
রাধার কালিয়া নিষ্কলঙ্ক মনেতে ব্যথা দিয়েছে। তাই রাধার মন বিরহে প্রেম যাতনায় কাতর। এ প্রেমের জ্বালা সাপের বিষের থেকেও যন্ত্রণাময়। কোন ডাক্তার বৈদ্যের সাধ্য নাই এই যন্ত্রণা দূর করবার।

আধ্যাত্মিক ভাটিয়ালী
তিন ধারার ভাটিয়ালীর মধ্যে যে ধারার ভাটিয়ালী সবচাইতে জনপ্রিয়- তা হল নাইয়া, দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক ভাটিয়ালী। দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক ভাটিয়ালীর রূপক দর্শন ও ছলনা সাধারণ মানুষের মনে বিস্ময় তৈরি করে, যা অন্যান্য ভাটিয়ালী থেকে অনেক বেশি জনপ্রিয়। এ গানে কখনো কখনো জাগতিক জীবনের অশান্তি এবং দুঃখ সহ্য করতে না পেরে রূপকের মাধ্যমে স্রষ্টাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। যেন জাগতিক জীবন অর্থাৎ ভাবসাগর পাড়ি দেবার কঠিন পথ অতি সহজে অতিক্রম করা যায়।

আধ্যাত্মিক ও দেহতত্ত্বের গানগুলো বৈষ্ণব-সুফী-বাউল-মুর্শিদী ইত্যাদি তত্ত্বের সাথে খুব বেশি প্রভাবিত হয়েছে। তাই আধ্যাত্মিক ও দেহতত্ত্ব বিষয়ক গান ও মুর্শিদী গানের মধ্যে পার্থক্য করা খুব সহজ নয়। তাই বৈষ্ণব, সুফী, মুর্শিদী, বাউল ভাবনার সাথে ভাটিয়ালী দর্শনের কিছুটা মিল পাওয়া যায়। তবে আধ্যাত্মিক তত্ত্বের ভাটিয়ালীর রচয়িতা ঐতিহাসিক ব্যক্তি বলে মনে করা হয়। কারণ তাদের কালের আবির্ভাবের সাথে আধ্যাত্ম তত্ত্বের ভাটিয়ালী গানের আবির্ভাবের ইতিহাস সম্পর্কিত বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
আধ্যাত্মিক ভাটিয়ালী-
‘এ ভব সাগর কেমনে দেব পাড়ি
দিবা নিশি কান্দিরে নদীর কোলে বইয়া।।
ও মনরে যার আছে রসিক নাইয়া,
আগে তরী গেল বাইয়া রে।
আমি ঠ্যেইক্যা রইলাম বালুচরে মাঝিমাল্লা লইয়ারে।।
ও মনরে ভাবসাগরের ঢেউ দেখিয়ারে,
প্রাণ-পাখি যায় উড়িয়া রে।
আমি হতভাগা পইড়া গো রইলাম
ভাঙ্গাতরী লইয়ারে।।’
আধ্যাত্মিক ভাটিয়ালীর এই যে রূপক এবং ছলনার আশ্রয়, তা যেন স্রষ্টার কাছে সৃষ্টির কৃতকর্মের এক ধরনের অনুতাপ। তার প্রেমে নিজেকে ভাবসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে স্রষ্টার কাছে ভক্তি ও ভালোবাসা নিবেদন করে নিজেকে সমর্পণ করা। আধ্যাত্মিক ভাটিয়ালীর করুণ আর্তির দীর্ঘ টানেই যেন নাইয়া তার স্রষ্টার সাথে যোগাযোগের একটি মাধ্যম তৈরি করে নেয়।

যেকোন ধর্ম সাধনায় স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মানুষ নির্জনতাকেই বেছে নেয়। গ্রামের মাঝি-মাল্লারা যখন নৌকা নিয়ে অথৈ সাগরে ভাসতে থাকে তখন জাগতিক সমস্ত মায়াজাল থেকে দূরে থাকে। ঠিক সেই সময়েই ভব সাগর অর্থাৎ জাগতিক জীবন ছেড়ে যাবার চিন্তা মাঝির মনে উদয় হয়। পৃথিবীর পাপ-পূণ্যের কথা হিসাব-নিকাশ করে এবং ভাবে যে, যারা পূণ্যের কাজ করেছে তারা হয়তো এ জীবনে তাড়াতাড়ি পাপমুক্ত হয়ে জীবন সাগর পাড়ি দিতে পারবে। আর যারা পূণ্যের কাজ থেকে বিরত থাকবে, তাদের আসবে পদে পদে বাধা। সুতরাং জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ পার্থিব জীবনে মানব কল্যাণে এবং স্রষ্টাকে ভালোবাসার জন্য নৌকার মাঝির মন ডুকরে কেঁদে ওঠে-
‘নদীর কূল নাই কিনার নাইরে।
আমি কোন কূল হইতে কোন কূলে যাব,
কাহারে শুধাইরে।।
ওপারে মেঘের ঘটা
কনক বিজলি ছটা
মাঝে নদী বহে শাই শাইরে।
আমি এই দেখিলাম সোনার ছবি
আবার দেখি নাইরে।।
বিষম নদীর পানি
ঢেউ করে হানাহানি
ভাঙ্গা এ তরণী তব বাইরে।
আমার অকূলের কূল দয়াল বন্ধুর
যদি দেখা পাইরে।।’
নৌকার মাঝি নৌকা নিয়ে দূর-দূরান্তরের পথে জীবিকার আশায় শুধু চাঁদ আর নক্ষত্রদের নিয়ে এগিয়ে চলছে বন্দরের দিকে। কিন্তু মাঝ দরিয়ায় এসে যখন নদীর কূল কিনারা খুঁজে পায় না; তখন মাঝি একাকি নিঃসঙ্গ হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিষম নদীর ঢেউ যখন ঝড়ো হাওয়ায় তাণ্ডব শুরু করে দেয়, তখন হয়তো বা ফেলে আসা প্রিয়জনদের কাছে যেতে হাহাকার করে মাঝির মন। তখন দয়াল ছাড়া তার আর কোন পথ থাকে না। এ হচ্ছে এ গানের সাধারণ দর্শন। আর আধ্যাত্মিক দর্শনের কথা যদি বলা হয়, অর্থাৎ এ গানে যদি রূপক, ছলনা এবং ভণিতার আশ্রয় নেওয়া হয়ে থাকে তাহলে নদীকে জীবনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তার জীবন কোন দিকে পরিচালনা করবে সেই চিন্তায় মাঝি দিশেহারা। মাঝে মাঝে মানুষের জীবনে যখন ঝড় বয়ে যায়, তখন মানুষ বিচলিত হয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাই সৃষ্টিকর্তার শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আর কোন আশ্রয় খুঁজে পায় না মানুষ।

নৌকার মাঝি-মাল্লাদের জন্য ভাটিয়ালী ছাড়াও আর এক ধরনের গান আছে তা হল সারিগান। তবে সারিগান ভাটিয়ালীর মত একক কোন সংগীত নয়। এ গানে মাঝির দল বিরাট নৌকায় চড়ে সমবেত হয়ে উচ্চস্বরে একসাথে গান ধরে। যেখানে কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করে এবং কেউ কেউ শরীরের অঙ্গভঙ্গি দ্বারা অন্যদেরকেও অনুপ্রাণিত করে।

অপরদিকে ভাটিয়ালী গান একক সংগীত হওয়াতে এতে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, একাকীত্ব, নির্জনতা, উদাসীনতা, ভাবের উদয়ে আধ্যাত্মিক চিন্তার অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায়। এ গানের নাইয়া অর্থাৎ নৌকার মাঝি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়াতে ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনার স্বাধীনতায় এ গান প্রভাবিত হয়। সব ধরনের ভাটিয়ালীর তুলনায় আধ্যাত্মিক ভাটিয়ালীর ক্ষেত্রে নির্জনতাই যেন স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির যোগাযোগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়। যে পরিবেশে একাগ্রচিত্তে স্রষ্টার প্রতি হৃদয়ের গহীন থেকে অকৃত্রিম ভালোবাসা অনুভব করা যায়, যা ভাটিয়ালী গানের মূলশক্তি। যেহেতু ভাটিয়ালী গান মূলত আধ্যাত্মিক ও দেহতাত্ত্বিক ভাবের প্রাধান্যই বেশি পেয়েছে, তাই যুগে যুগে যত ধর্ম, কাব্যসাহিত্য প্রভাবিত করুক না কেন- এই শ্রেণির ভাটিয়ালীকে কোনো ধরনের পঙ্কিলতা অথবা যৌনতা স্পর্শ করতে পারেনি। তাই ভাটিয়ালীর এই শ্রেণির গান অত্যন্ত মার্জিত, পরিশীলিত, সরল, সংক্ষিপ্ত এবং পবিত্র।

অন্যান্য লোকসংগীতের তুলনায় ভাটিয়ালীর বৈচিত্র্য কম হলেও ভাব এবং সুরের মূর্ছনা এবং আবেগ সত্যি অদ্বিতীয়। জোছনা রাতে নৌকার বৈঠার সাথে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে জলের যে খেলা, তাতে নৌকার মাঝি ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে কোন এক অচীন দেশে পাড়ি জমাতে উদ্ভূত হয়।

অন্যান্য লোকজ সংগীত থেকে ভাটিয়ালী গানের স্বতন্ত্রতার আরেকটি কারণ হল এর করুণ সুর। বাংলাদেশে প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন এবং স্বজনহীন হয়ে পড়ে। নদীর ভাঙন কেড়ে নেয় তাদের শেষ আশ্রয়স্থল। সে সময় নৌকা নিয়ে পানিতে ভাসা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না মাঝির। তাই বাংলাদেশের নিরন্ন মানুষগুলো যখন জীবিকার প্রয়োজনে আর কোন উৎস খুঁজে না পায়, তখন নদী ও সমুদ্রের মাঝে নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে জীবিকার প্রয়োজনে সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে ঝাঁপ দেয়।
এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘদিন পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে দিনের পর দিন নৌকায় ভাসতে থাকে। সমদ্রের অথৈ জলে তখন এই উত্তাল তরঙ্গের সাথে আকাশ-বাতাস প্রকৃতি আর সমুদ্রের জলের যে ঐন্দ্রজালিক মাখামাখির দ্যোতনা তৈরি হয়, সেই দ্যোতনাই তৈরি করে ভাটিয়ালী গানের করুণ সুর। ভাটিয়ালীর এই রূপক ও ছলনার দর্শনে বাংলার মাঝির পরম সত্তাকে খুঁজে ফেরে বাংলার নিরন্ন দার্শনিকেরা।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *