রাত ১০:৪৯ | ৬ই মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৯শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং
ব্রেকিং নিউজ

নির্বাচন নিয়ে তৎপর কূটনীতিকরা

স্টাফ রিপোর্টার :  আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তৎপর হয়ে উঠছেন বিদেশি কূটনীতিকরা। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এজন্য নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ঘন ঘন সাক্ষাত করছে ঢাকাস্থ বিভিন্ন মিশনের প্রতিনিধিরা। সাক্ষাৎকালে তারা সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে ইসিকে ‘সহযোগিতার আশ্বাসও’দিচ্ছেন। অবশ্য বিদেশি কূটনীতিকদের এ ধরনের তৎপরতাকে বিএনপি স্বাগত জানালেও আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন।
কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরের মাস থেকেই ঢাকাস্থ বিভিন্ন মিশনের প্রতিনিধিরা কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে কথা বলছেন। কমিশনের দায়িত্ব দেওয়ার এক মাসের মাথায় গত ১২ মার্চ বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত সিডসেল ব্লেকের ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূত জোহান ফ্রিসেল সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৮ মে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, ৩১ মে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট, ৬ জুন ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক এবং সর্বশেষ রবিবার ইউএনডিপির তিন সদস্যের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদীপ্ত মুখার্জি সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া আগামী ২০ জুন ইউএন রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটরের ইসির সঙ্গে সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
এর আগে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের সময়ও এ বছর জানুয়ারিতে কূটনীতিকদের তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। ওই সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য জাতিসংঘের মাধ্যম যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ৬টি দেশের প্রতিনিধি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল। তবে, ইসি নিয়োগ কোন দেশের একান্ত রাষ্ট্রীয় বিষয়টি উল্লেখ করে ওই সময় রাষ্ট্রপতি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি।
ইসির সঙ্গে কূটনীতিকদের সাম্প্রতিক সাক্ষাতগুলোকে সৌজন্য সাক্ষাৎ বলা হলেও এতে প্রাধান্য পাচ্ছে দেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব সাক্ষাতে বিদেশি দূতগণ একাদশ জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কী করতে চায় তা জানতে চাইছেন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে কোন সহায়তারও আশ্বাস দিয়েছেন তারা। এসব সাক্ষাতে তারা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নির্বাচন চান না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তাদের এই প্রত্যাশার সঙ্গে একমত পোষণও করেছে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ঘন ঘন সাক্ষাত করে নির্বাচন নিয়ে কথা বলার বিষয়টিকে বিদেশি হস্তক্ষেপ উল্লেখ করে জাতীয় সংসদে সমালোচনা হয়েছে। সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী ইসির সঙ্গে সাক্ষাতের পর বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মার্কিন দূতের মন্তব্যকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বর্হিভূত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, কোনও স্বাধীন দেশের বিষয়ে অন্য কোনও দেশের দূতের এত ঘটা করে মন্তব্য করার নজির আছে বলে জানা নেই।
নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আর্কষণ করে তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক পদে যারা আছেন তাদের সঙ্গে অন্য দেশের নাগরিক কীভাবে এভাবে অনায়াসে দেখা করেন? আর দেখা করে বেরিয়ে এলে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে কীভাবে একজন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যের জন্য চাতক পাখির মত কেন তাকিয়ে থাকে তাও বোধগম্য নয়। এসব ঘটনা জাতি হিসেবে আমাদের কতটা ছোট করে?’
আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। তাদের সঙ্গে বেগম জিয়া, ফখরুল সাহেবরা সহায়ক সরকারের কথা বলছেন। কিন্তু সংবিধানে নিরপেক্ষ সরকার বলে কিছু নেই। সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে।’
এর আগে শুক্র ও শনিবার অনুষ্ঠিত দলটির পলিটব্যুরোর সভার প্রস্তাবে বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের ওপর বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ওই সভার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এক বৈঠকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের সঙ্গে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে এক কাতারে ফেলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মন্তব্য করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কমিশনও সেই মন্তব্যের সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে।
দলটি বলছে, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের নির্বাচন পরিচালনা করা তাদের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রদূতের কী বলার থাকতে পারে, তা বোধগম্য নয়। এটা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতেরা খোদ নির্বাচন কমিশনে গিয়ে কমিশনের কাজে নাক গলাচ্ছেন। রাষ্ট্রদূতদের বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে মন্তব্য করা কতটা সমীচীন, সেটাও তারা ভেবে দেখছেন না।
অবশ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাত ও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশি দূতদের সরব অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বিএনপি।
দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু  বলেন, বিদেশি এই তৎপরতাকে আওয়ামী লীগ বা তার ঘনিষ্ঠ কিছু মিত্র ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ’ বলার চেষ্টা করছেন। তারা সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক নির্বাচন চান না বলেই এটা বলছেন। এজন্য সুষ্ঠু ভোটের কথা যেই বলুন না কেন তিনিই তাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিদেশিদের ডেকে ডেকে মুক্তিযুদ্ধে সমর্থনের জন্য সম্মাননা দিতে পারি। তাহলে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের সুন্দর পরামর্শগুলো কেন আমরা সহজভাবে নিতে পারি না। আমরা কেন তাদেরকে বিদেশি হিসেবে নিচ্ছি। কেন আমরা উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা দেশ হিসেবে দেখছি না।’
বিশ্বের কেউই এখন একলা চলতে পারে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনের জন্যই বিদেশিরা পরামর্শ দিচ্ছে। এটাকে অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো পৌরানিক কথাবার্তা না বলাই ভালো। সব বিরোধী দল, সারা বিশ্ব, পেশাজীবী ও গণমাধ্যম গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচন চায়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ  বলেন, ‘বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। স্বাধীনভাবেই দেশ চলবে। বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে এভাবে নির্বাচন নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা কাম্য নয়।’
কমিশনও স্বাধীনভাবে কাজ করবে এটা সকলের প্রত্যাশা মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর আমাদের দেশের বিষয় নিয়ে আগ্রহ রয়েছে এটা ভালো দিক। কমিশনকে শক্তিশালী করা বা নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনও পরমর্শ থাকলে তারা দিতে পারেন। কিন্তু তারা অতি আগ্রহ দেখাতে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে যেভাবে হস্তক্ষেপ করছেন যেটা কখনোই কাম্য নয়।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম  বলেন, ‘যারা এটাকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা নাক গলানোর কথা বলছেন, তারাই একসময় অন্যভাবে কথা বলেছিলেন। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোনও দ্বীপ নয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সবাইকে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। যারা কমিশনের সঙ্গে দেখা করেছেন তারা হস্তক্ষেপ করছেন বা খবরদারি করছেন, এমন কোনও তথ্য আমরা দেখিনি। অতীতে বিভিন্ন কমিশন উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা নিয়েছে। এখনও সে ধরনের সহযোগিতা আসে, তাতে তো দোষের কিছু নেই।’
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ  বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। যে কেউ দেখা করতে চাইলে কমিশন তাদেরকে এড়িয়ে যেতে পারে না। অনেকে কমিশনের সঙ্গে দেখা করছে কমিশন এতে মনে করছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। এটা রুটিনওয়ার্ক।’
তিনি বলেন, ‘নতুন কমিশনের সঙ্গে তারা সৌজন্য সাক্ষাত করেছেন। এই সাক্ষাতকালে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা কিছু পরামর্শ দিয়েছে। তারা এমন কোনও কথা বলেননি যেটাতে মনে হতে পারে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হয়েছে। তারা কমিশনের কাজে কোনও নির্দেশনা দিচ্ছেন না বা মুরুব্বিয়ানাও দেখাচ্ছেন না।’

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *